বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৭:১৫ অপরাহ্ন
অনলাইন ডেস্ক ,
প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় অমানবিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। প্রতিদিনই ঝরছে নিরীহ মানুষের রক্ত। নারী-শিশু থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মী—কেউই রক্ষা পাচ্ছেন না। এই যুদ্ধ শুধু নির্মম হত্যাযজ্ঞ হিসেবেই নয়, বরং ইতিহাসে স্থান করে নিচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের আত্মত্যাগের সাক্ষী হিসেবে।
২০২৫ সালের ১০ আগস্ট—এই তারিখ চিরকাল মনে রাখবে বিশ্ব। কারণ, সেদিনই ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারান আলজাজিরার তরুণ সাংবাদিক আনাস-আল শরিফ। তার মতো আরও ২২২ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক গত দুই বছরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের (আইএফজে) তথ্য অনুযায়ী, সত্য প্রকাশের অপরাধেই তারা নিহত হয়েছেন। যারা গণহত্যার সাক্ষীদের মুছে দিতে চায়, তারা ইতিহাসে নিন্দিত হয়েই থাকবে।
গাজায় এখন সাংবাদিকদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। গত ২৪ মাস ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করা মানেই মৃত্যু ডেকে আনা। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সত্য সংবাদ এখন নির্ভর করছে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ওপর—যাদের প্রায় সবাই আইএফজের সদস্য। আশ্রয়হীন, সুরক্ষাহীন এই সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
বিশ্ব ইতিহাসে এর আগে কোনো যুদ্ধেই সাংবাদিক হত্যার এমন নজির নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান—কোনো সময়ই এত সাংবাদিক নিহত হয়নি। গাজা এখন সত্য সন্ধানী সাংবাদিকদের কবরস্থানে রূপ নিয়েছে।
তবে এই হত্যাযজ্ঞ কাকতালীয় নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ। গাজার বর্বরতা লিপিবদ্ধ করা সাক্ষীদের হত্যা করে সত্য গোপন করছে ইসরায়েল। গণমাধ্যমের প্রবেশ বন্ধ রেখে বিশ্ববাসীকে অন্ধকারে রাখার এ নীতি আসলে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ বন্ধ করারই কৌশল।
এমন সময়েই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন—গাজাকে পুনরায় উপনিবেশ বানাবেন। অর্থাৎ, পুরো অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে আনতে গাজাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। উত্তর সীমান্ত থেকে গাজা শহর পর্যন্ত লাখো বাসিন্দাকে দক্ষিণে পালাতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু দক্ষিণও আর নিরাপদ নয়। তারা এখন বোমা আর সাগরের মাঝে আটকে আছে। এই বাস্তবতা সাংবাদিকদেরও; যারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতিসংঘের বহু সদস্য রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু তাতে গাজার মৃত বা জীবিত কেউই ন্যায়বিচার পাবেন না। কারণ, যেসব দেশ ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং তার কর্মকাণ্ডে নীরব থেকেছে, তারাই এখন ‘শান্তির দূত’। ফলে গাজার সাংবাদিকদের লড়াই তাদের একারই। তারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত গাজাবাসীর সত্য তুলে ধরার শপথ নিয়েছেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৬২ ত্রাণকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, দেইর আল-বালাহ এলাকায় মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)-এর একটি দল আক্রান্ত হয়। এতে থেরাপিস্ট ওমর হায়েক (৪২) নিহত হন, আহত হন চারজন।
এমএসএফ জানায়, নিহতসহ তাদের কর্মীরা সবাই স্পষ্ট পরিচয়সহ কাজ করছিলেন। এখন পর্যন্ত নিহত ত্রাণকর্মীর মধ্যে ৩৭৬ জন জাতিসংঘের কর্মী।
এই ভয়াবহ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৬৬ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। অব্যাহত বোমা হামলায় গাজা পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ ও রোগব্যাধি।
গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গাজায় গণহত্যার দায়ে চলছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা।